বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস

শাটডাউনের অনিশ্চয়তার মাঝে সুদহার কর্তনের পথে ফেড

চলমান শাটডাউনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত অর্থনৈতিক প্রতিবেদনগুলোর বেশির ভাগের প্রকাশ বন্ধ রয়েছে, যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয়াকে কঠিন করে তুলেছে।

চলমান শাটডাউনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত অর্থনৈতিক প্রতিবেদনগুলোর বেশির ভাগের প্রকাশ বন্ধ রয়েছে, যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয়াকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। কারণ আগামীকাল শুরু হতে যাওয়া ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির (এফওএমসি) বৈঠক থেকে সুদহার কর্তনের ঘোষণা প্রত্যাশা করা হচ্ছে। অবশ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, তথ্য ঘাটতি সত্ত্বেও সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তই নেবে ফেড। খবর আনাদোলু।

বাজার পূর্বাভাস অনুসারে এবার ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদহার কর্তন করবে এফওএমসি। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে চলতি বছরে প্রথমবারের মতো সুদহার কমিয়ে আনে ফেড। তখনই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে কমপক্ষে দুই দফা সুদহার কর্তনের আভাস দেয়া হয়।

বাজেট নিয়ে কংগ্রেসে সৃষ্ট মতানৈক্যের সূত্র ধরে ১ অক্টোবর থেকে শাটডাউন পালিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। এ কারণে দেশটির ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকস (বিএলএস) সাপ্তাহিক বেকারত্বের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেনি। উৎপাদক মূল্যসূচক (পিপিআই) প্রকাশ করা যায়নি। তবে দেরিতে হলেও প্রকাশ হয়েছে ভোক্তা মূল্যস্ফীতির (সিপিআই) তথ্য। অথচ ফেডের সুদহার সম্পর্কিত যেকোনো সিদ্ধান্ত এখন মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান তথ্যের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করছে।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মাসিক ও বার্ষিক হারে সিপিআই বেড়েছে যথাক্রমে দশমিক ৩ ও ৩ শতাংশ, যা বাজার প্রত্যাশার তুলনায় কম বৃদ্ধি। অন্যদিকে জ্বালানি ও খাদ্য বাদ দিয়ে মূল্যস্ফীতি হয়েছে যথাক্রমে দশমিক ২ ও ৩ শতাংশ হারে। এটিও প্রত্যাশার তুলনায় কম বৃদ্ধি।

হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতির কারণে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা যদি শাটডাউন বহাল রাখে, তাহলে অক্টোবরের মূল্যস্ফীতির তথ্য পাওয়া যাবে না। এটি ব্যবসা, বাজার, পরিবার ও ফেডারেল রিজার্ভের কার্যক্রমকে ব্যাহত করবে।’

এখন নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বেসরকারি তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর। এর মধ্যে রয়েছে এডিপি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থান প্রতিবেদন এবং চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিসমাসের ছাঁটাই প্রতিবেদন। যেখানে বলা হচ্ছে, সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে বেসরকারি খাতে ৩২ হাজার চাকরি কমেছে, যা প্রত্যাশার তুলনায় বেশি। জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে মার্কিন কোম্পানিগুলো যে পরিমাণ ছাঁটাই করেছে, তা ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ, ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৪২৬ জন।

বিএলএসের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, আগস্টে নন-ফার্ম পে-রোল অর্থাৎ কৃষি খাত বাদে নতুন কর্মসংস্থান বেড়েছে ২২ হাজার, যা প্রত্যাশার তুলনায় কম। বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

সম্প্রতি ফেড চেয়ার জেরোম পাওয়েল জানিয়েছেন, শাটডাউনের কারণে কিছু তথ্য প্রকাশ বিলম্বিত হয়েছে। তবে রাজ্যভিত্তিক বেকার ভাতার আবেদন ও এডিপি তথ্য পর্যবেক্ষণ করছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সুদহার কমানোর বিষয়ে কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি তথ্যের বিপরীত অবস্থান ফেডের জন্য টানাপড়েন তৈরি করেছে। জেরোম পাওয়েল বলছেন, ‘কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ঠিক রাখার ক্ষেত্রে ঝুঁকিমুক্ত কোনো নীতি নেই।’

এ পরিস্থিতিতে ফেড কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা যাচ্ছে। কেউ মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি এখনো বেশি। তাই সুদহার কর্তন ঝুঁকিপূর্ণ হবে। আরেক পক্ষ বলছে, শ্রমবাজারের মন্দার কারণে সতর্ক পদক্ষেপ হিসেবে সুদহার কর্তন প্রয়োজন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ফেডকে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং নীতিনির্ধারণে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে মূল অর্থনৈতিক সূচক প্রকাশে ব্যাঘাত। যাকে বলা হচ্ছে, ‘ডাটা ডার্কনেস’।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক কো-হেড অর্থনীতিবিদ মাইকেল পিয়ার্সের মতে, সেপ্টেম্বরে সিপিআই বৃদ্ধির হার ছিল কম। এ কারণে সুদহার কর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে ফেড। তবে ফেডের লক্ষ্য ২ শতাংশ হলেও আগামী বছরের বেশির ভাগ সময় মূল্যস্ফীতি ৩ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে। তাই ২০২৬ সালে কয়েক দফা সুদহার কমানোর বাজার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

তিনি বলেন, ‘সুদহার কমানোর গতি ধীর করবে ফেড। আগামী বছর তিন দফা কাটছাঁট আসতে পারে।’

মাইকেল পিয়ার্সের অনুমান আমদানি পণ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপিয়ে দেয়া শুল্ক মূল্যস্ফীতিতে দশমিক ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট অবদান রেখেছে। তিনি বলেন, ‘কর্মসংস্থান পরিস্থিতি সম্প্রতি উন্নত হয়েছে তা দেখানোর জন্য কোনো তথ্য নেই। তাই সুদহার কর্তন করবে ফেড, তা নিশ্চিত। অর্থনীতিতে নিচের দিকে ঝুঁকি কমে গেলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আগামী বছরে গুরুত্ব পাবে, যা ধীরগতির সুদহার কর্তনের নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।’

গবেষণা সংস্থা এইআইয়ের সিনিয়র ফেলো স্টিভেন কামিন মনে করেন, ফেড এবারের বৈঠকে সুদহার কমাবে। এটি নিরাপদ সিদ্ধান্ত। কারণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং শ্রমবাজারে ঝুঁকি কম। শাটডাউন শেষ হলে ফেড ডিসেম্বরে আবার নীতি পর্যালোচনা করবে।

ফিচ রেটিংসের মার্কিন অর্থনৈতিক গবেষণা বিভাগের প্রধান ওলু সোনোলা বলেন, ‘‌মূল্যস্ফীতির তথ্য ফেডের জন্য স্বস্তির এবং সম্ভবত তা সেপ্টেম্বরের পর দ্বিতীয় দফায় সুদহার কমানো ব্যাহত করবে না। অদ্ভুত মনে হলেও ফেড আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৩ শতাংশ থাকায় খুশি হবে। শুল্কের প্রভাব সাধারণত কমে গেছে এবং এখন দুর্বল শ্রমবাজারের দিকে মূল মনোযোগ তাদের।’

আরও